ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও শতবর্ষী জমিদার বাড়ি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 22, 2026 ইং
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও শতবর্ষী জমিদার বাড়ি ছবির ক্যাপশন: প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও শতবর্ষী জমিদার বাড়ি
ad728
প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মৃতি কালের গহ্বরে ঢাকা পড়লেও এর নিদর্শন চিরকাল অম্লান। রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার জমিদার বাড়িটি তেমনই একটি স্মৃতিচিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ১২৬ বছরের পুরনো এ বাড়িটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রূপগঞ্জের ইতিহাস, কৃষ্টি, সভ্যতা ও আজকের এই কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে মহাকালের নীরব সাক্ষী হয়ে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার এ জমিদার বাড়িটি। ছায়া নিবিড় পরিবেশে গড়ে ওঠা মনোমুগ্ধকর এ জমিদার বাড়ি যেকোনো পর্যটকের মন কাড়বে। 

উপজেলার মুড়াপাড়া এলাকায় ৬২ বিঘা জমির ওপর এই প্রকাণ্ড জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। জমিদার বাবু রাম রতন ব্যানার্জী তৎকালিন মুড়াপাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন। রাম রতন ব্যানার্জীর ছেলে পিতাম্বর ব্যানার্জী এবং তার ছেলে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী শাহজাদপুরের জমিদারি ক্রয় করে জমিদারি বর্ধন করেন।

কথিত আছে জমিদারি ক্রয় সূত্রে প্রতাপ ব্যানার্জীর সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। ১৮৮৯ সালে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জীর পৈতৃক এজমালি পুরনো বাড়ি ত্যাগ করে আলোচ্য এ প্রাসাদের পেছনের অংশ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জীর ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ১৮৯৯ সালে প্রাসাদের সম্মুখ অংশের একতলা ভবন নির্মাণ ও সেখানে ২টি পুকুর খনন করার পর হৃদরোগে মারা যান। তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের প্রথম গ্রাজুয়েট। 

বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর দুই ছেলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জী ১৯০৯ সালে প্রাসাদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। এ অঞ্চলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। কারণ তিনি দু`বার দিল্লীর কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ববঙ্গ হতে সদস্য নির্বাচিত হন। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী প্রজা সাধারণের কল্যাণ সাধনের জন্য স্থাপন করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পুকুর। এই জনহিতকর ইতিহাসের উল্টোপিঠেই রয়েছে অত্যাচার ও নির্যাতনের বহু ঘটনা। রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি। 

বিশাল এ জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। নাচ ঘর, আসত্মাবল, উপাসনালয়, কাচারিঘরসহ সবই ছিল এখানে। বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দর মহলে রয়েছে আরও ২টি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে মেয়েদের স্নানের জন্য ছিল শান বাধানো পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা। বাইরের লোকদের জন্য এখানে প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সচরাচর কোনো পুরুষ যেত না সেখানে। তখন এটি ছিল নীরব এক অনত্মপুরি।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পর জগদীশ চন্দ্র তার পরিবার নিয়ে কলকাতা গমন করেন। এরপর থেকে বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাড়িটি দখল নেয় এবং এখানে হাসপাতাল ও কিশোরী সংশোধন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে স্কুল ও কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করা হত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটির দায়িত্ব গ্রহণ করে সেটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বর্তমানে এটি মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ নামে পরিচিত।

বাড়ির সামনে রয়েছে আরো একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশি কাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। আর চারদিকে চারটি শান বাধানো ঘাট। দিঘি বলেও কেউ মনে করতে পারেন। পুকুর জুড়ে পানি টলমল করছে। এত স্বচ্ছ পানি এতদঞ্চলে আর নেই। এ পুকুরের পানির বৈশিষ্ট্যটাই অন্য রকমের। পানিতে জমিদার বাড়ির প্রতিচ্ছবি ঢেউয়ের তালে দুলছে। মূলত এ পুকুরটি তৈরি করা হয়েছে বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যই। পুকুরের পরিমাপটাও অনেকটা প্রতিচ্ছবির হিসেব মিলিয়েই তৈরি করা। পুকুর সংলগ্ন মন্দির। মন্দিরের বড় দুটি চূড়া রয়েছে। তা প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এর প্রবেশদ্বারগুলো খিলান দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের মূল কক্ষ বেশ ছোট এবং অন্ধকার। 

মন্দিরের বা পাশ ঘেঁষে ছায়াঘেরা শান্ত শ্যামল প্রকাণ্ড আম্রকানন রয়েছে। গাছগুলো বেশ পুরনো। একই মাপের ঝাঁকরানো গাছ। ডালপালা ছড়ানো, অনেকটা ছাতার মতো। অসংখ্য গাছ। প্রায় প্রতিটি আমগাছের গোড়া পাকা করা। এখানে আছে সারি সারি পান ও সুপারি বাগান। এ ছাড়া জমিদার বাড়ির প্রবেশ মুখেই সারি সারি ঝাউগাছ। প্রতি বছর এখানে আসে পিকনিক পার্টি। এছাড়া সারা বছর ধরেই এখানে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। বিদেশি পর্যটকরাও আসেন এ বাড়িটিতে। এ বাড়িকে ঘিরে এ যাবৎ বহু চলচ্চিত্র, মিউজিক ভিডিও এবং টিভি নাটকের দৃশ্যধারণের কাজ হয়েছে। 

মূলত এ অঞ্চলের বহু স্মৃতি যুগ যুগ ধরে বহন করছে এ জমিদার বাড়িটি। নয়ন জুড়ানো রূপগঞ্জের এ জমিদার বাড়ির ভেতরের অপরূপ কারুকাজ, নিপুণ হাতের শিল্পকর্ম দেখে আজও পর্যটকরা বিস্মিত হন।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : A H M Hafizul Bari

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
রূপগঞ্জে কিশোরীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, আত্মহত্যা

রূপগঞ্জে কিশোরীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, আত্মহত্যা